ঢাকা, শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২

হাসান

রিপোর্টার

যে হাটে কেনা-বেচা হয় বিয়ের পাত্রী

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪ নিউজ
২০২৬ জানুয়ারি ০৯ ১৮:৩৬:৪৭
যে হাটে কেনা-বেচা হয় বিয়ের পাত্রী

হাসান: বাংলা সমাজে বিয়ের আয়োজন সাধারণত শুরু হয় পাত্র-পাত্রী দেখার আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে। পছন্দ হলে প্রস্তাব, এরপর কথাবার্তা, আর সব ঠিক থাকলে নির্ধারিত দিনে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া টাই পরিচিত চিত্র। কিন্তু ইউরোপের এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজও টিকে আছে এমন এক বিস্ময়কর ও বিতর্কিত প্রথা, যেখানে বিয়ে ঠিক হয় প্রকাশ্য এক ‘হাটে’, আর সেখানে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত হয় আর্থিক মূল্য।

এই রীতিতে নির্দিষ্ট দিনে বিবাহযোগ্য মেয়েদের সাজিয়ে-গুছিয়ে আনা হয় একটি খোলা জায়গায়। সেখানে উপস্থিত থাকেন সম্ভাব্য পাত্ররা। পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটা পাত্র-পাত্রী দেখার চেয়েও বেশি পণ্য বাছাইয়ের মতো। পাত্রপক্ষ মেয়েদের চেহারা, গায়ের রং, সৌন্দর্য ও সতীত্ব বিবেচনা করে দরদাম ঠিক করে। বয়সসীমা সাধারণত ১২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এই প্রথাটি চালু রয়েছে বুলগেরিয়ার রোমা বা রোমানি জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ‘কালাাইজ্জি ব্রাইড মার্কেট’ নামে পরিচিত এই বিয়ের হাট বহু বছর ধরে তাদের সমাজে প্রচলিত। এখানে কনে পক্ষ তাদের মেয়েদের সম্ভাব্য পাত্রদের সামনে উপস্থাপন করে। পাত্রপক্ষ যাচাই-বাছাই শেষে দেনমোহর বা অর্থের অঙ্ক নির্ধারণ করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।

বুলগেরিয়ার নির্দিষ্ট কিছু রোমা বসতিতে উৎসব উপলক্ষে এই আয়োজন বসে। মেয়েরা সেদিন ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে পরিবারের সঙ্গে হাজির হন। অনেক ক্ষেত্রেই একই দিনে বিয়ের শর্ত ও আর্থিক লেনদেন চূড়ান্ত হয়। ফলে এই বিয়ে কেবল সামাজিক বন্ধন নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক চুক্তির রূপ নেয়।

ইউরোপজুড়ে রোমা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এ কারণে অনেক পরিবার মনে করে, এই বিয়ের হাট মেয়েদের জন্য দ্রুত ও নিরাপদভাবে ‘উপযুক্ত পাত্র’ খুঁজে পাওয়ার কার্যকর মাধ্যম। আগেভাগেই খরচ নির্ধারিত থাকায় তারা এটিকে স্বচ্ছ ব্যবস্থাও মনে করে।

তবে আধুনিক সমাজে এই প্রথা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এখানে মেয়েদের মতামত অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। অর্থের বিনিময়ে বিয়ে নির্ধারণ নারীদের পণ্য হিসেবে দেখার শামিল। পাশাপাশি কম বয়সে বিয়ে, শিক্ষাজীবনের অবসান এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও বড় উদ্বেগের বিষয়।

আইন অনুযায়ী বুলগেরিয়ায় বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত থাকলেও, রোমা সমাজের বহু বিয়ে কেবল সামাজিক রীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধিত হয় না। ফলে আইনগত নজরদারি দুর্বল থেকে যায়, যা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

তবে পরিবর্তনের ইঙ্গিতও মিলছে। রোমা সমাজের নতুন প্রজন্মের একটি অংশ শিক্ষা ও কর্মজীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারা পারস্পরিক সম্মতিতে বিয়ে, নারীর সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান এবং অর্থনির্ভর সম্পর্ক থেকে সরে আসতে চায়। যদিও সমাজের একাংশ এখনো এই প্রথাকে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে রাখতে চায়।

সব মিলিয়ে, রোমা সম্প্রদায়ের এই বিয়ের হাট একদিকে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতীক, অন্যদিকে আধুনিক মূল্যবোধ ও নারী অধিকারের সঙ্গে তীব্র সংঘাতের প্রতিচ্ছবি। সময় ও সচেতনতার সঙ্গে এই প্রথা কোন পথে এগোয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ