ঢাকা, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২

নূর

রিপোর্টার

যৌন সমস্যা লজ্জার নয়: জানুন কারণ, প্রতিকার ও করণীয়

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪ নিউজ
২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১৬ ১২:০৪:১৮
যৌন সমস্যা লজ্জার নয়: জানুন কারণ, প্রতিকার ও করণীয়

নূর: যৌনতা নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও অনেক সংকোচ, ভুল ধারণা ও অর্ধসত্য প্রচলিত। অথচ যৌন স্বাস্থ্য মানে কেবল যৌন মিলন নয় এটি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত প্রতিফলন। World Health Organization (WHO)-এর মতে, প্রত্যেক মানুষের নিরাপদ, সম্মানজনক ও আনন্দদায়ক যৌন জীবন উপভোগ করার অধিকার রয়েছে।

তবু নানা শারীরিক জটিলতা, মানসিক চাপ ও সম্পর্কগত সমস্যার কারণে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি হতে পারে। বিষয়টি লজ্জার নয় বরং সচেতনতার।

কোন কোন যৌন সমস্যা বেশি দেখা যায়?

যৌন সমস্যা নারী ও পুরুষভেদে ভিন্ন হলেও কিছু সাধারণ জটিলতা প্রায়ই দেখা যায়—

ইরেকটাইল ডিসফাংশন (Erectile Dysfunction):পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা। মিলনের জন্য পর্যাপ্ত লিঙ্গোত্থান না হওয়া বা তা ধরে রাখতে না পারা এই সমস্যার প্রধান লক্ষণ।

দ্রুত বীর্যপাত (Premature Ejaculation):অল্প সময়ের মধ্যেই বীর্যপাত হয়ে যাওয়া, যা সঙ্গী ও নিজের উভয়ের জন্য হতাশার কারণ হতে পারে।

যৌন ইচ্ছার অভাব (Low Libido):শারীরিক ক্লান্তি, হরমোনজনিত পরিবর্তন বা মানসিক চাপে মিলনের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া—এটি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

ব্যথাযুক্ত মিলন (Dyspareunia):বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মিলনের সময় ব্যথা অনুভূত হওয়া। সংক্রমণ বা হরমোনাল পরিবর্তন এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

কেন হয় এসব সমস্যা?

যৌন সমস্যার কারণ সাধারণত দুই ধরনের—শারীরিক ও মানসিক।

শারীরিক কারণ

ক্রনিক রোগ:ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা কিডনি জটিলতা রক্তসঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি করে, যা সরাসরি যৌন সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা:পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি এবং নারীদের ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি যৌন ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে।

অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন:অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও স্থূলতা (Obesity) যৌন সমস্যার বড় ঝুঁকি।

ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:কিছু উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বা অ্যান্টি-ডিপ্রেশনাল ড্রাগ সাময়িকভাবে যৌন ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

মানসিক কারণ

উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা:দৈনন্দিন জীবনের চাপ বা হতাশা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কামোদ্দীপক সংকেতকে ব্যাহত করে।

পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি:“আমি পারব তো?”—এই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা সাময়িক সমস্যাকে স্থায়ী রূপ দিতে পারে।

সম্পর্কের টানাপোড়েন:সঙ্গীর সঙ্গে মনোমালিন্য বা বিশ্বাসের ঘাটতি যৌন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ভুল ধারণা বনাম বাস্তবতা

সমাজে প্রচলিত অনেক কবিরাজি বা হাতুড়ে চিকিৎসা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। তথাকথিত “যৌন শক্তিবর্ধক” অনেক ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।

বাস্তবতা হলো—বেশিরভাগ যৌন সমস্যা জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও বিশেষজ্ঞের সঠিক পরামর্শে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য, এমনকি নিরাময়যোগ্য।

সুস্থ থাকার করণীয়

পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস:জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার—বাদাম, সামুদ্রিক মাছ, মাংস—খাদ্যতালিকায় রাখুন। ভিটামিন ডি ও শাকসবজি গুরুত্বপূর্ণ। ডার্ক চকলেট ও তরমুজ রক্তসঞ্চালনে সহায়ক।

নিয়মিত ব্যায়াম:ব্যায়াম রক্তপ্রবাহ বাড়ায়। বিশেষ করে কিগেল এক্সারসাইজ (Kegel Exercise) নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য যৌন পেশি শক্তিশালী করতে কার্যকর।

পর্যাপ্ত ঘুম:প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

নেশামুক্ত জীবন:ধূমপান রক্তনালী সংকুচিত করে, যা যৌন অক্ষমতার বড় কারণ। তাই নেশা পরিহার জরুরি।

খোলামেলা যোগাযোগ:সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা অনেক সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

যদি কোনো সমস্যা তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে এবং ব্যক্তিগত বা দাম্পত্য জীবনে প্রভাব ফেলে, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ইউরোলজিস্ট (Urologist) বা সেক্সোলজিস্ট (Sexologist) সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সমাধান দিতে পারেন।

মনে রাখবেন—যৌন সমস্যা লজ্জার নয়; এটি জ্বর বা ডায়াবেটিসের মতোই একটি স্বাস্থ্যগত বিষয়।

যৌন স্বাস্থ্য হলো সামগ্রিক জীবনমানের প্রতিফলন। সুস্থ জীবনযাপন, ইতিবাচক মানসিকতা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ—এই তিনটি বিষয় মেনে চললে অধিকাংশ যৌন সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

নিজেকে জানুন, সচেতন থাকুন, সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলুন—তবেই উপভোগ করুন পূর্ণাঙ্গ ও আনন্দময় জীবন।

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ