ঢাকা, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২

রাকিব

সিনিয়র রির্পোটার

২০২৬ সালের নির্বাচনে যা কিছু প্রথম

জাতীয় ডেস্ক . ২৪ নিউজ
২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১৬ ০২:০৫:০০
২০২৬ সালের নির্বাচনে যা কিছু প্রথম

জুলাই বিপ্লবের রক্তস্নাত পথ পেরিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এটি আর দশটি সাধারণ নির্বাচনের মতো ছিল না। এবার ব্যালট পেপার থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিটি স্তরেই ছিল নজিরবিহীন সব পরিবর্তন। ইতিহাসের পাতায় এই নির্বাচন যে কারণে অমর হয়ে থাকবে, তার পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:

১. সংসদীয় ভোট ও গণভোট (Referendum): একই সঙ্গে দুই লড়াই

বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম একই দিনে দুটি ভোট দিয়েছেন নাগরিকরা। একটি ছিল তাদের পছন্দের সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য (সাদা ব্যালট), আর অন্যটি ছিল 'জুলাই জাতীয় সনদ' বা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে সম্মতি দেওয়ার জন্য (গোলাপী ব্যালট)। ১৯৯১ সালের পর দেশে এটিই প্রথম কোনো গণভোট।

২. দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা

গণভোটের মাধ্যমে জনগণ প্রথমবারের মতো এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে:

উচ্চকক্ষ (Upper House): প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ বা 'সিনেট' গঠিত হতে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ: কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি (সর্বোচ্চ ১০ বছর) প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে পারবেন না—এমন বিধান এবারই প্রথম সাংবিধানিকভাবে গৃহীত হতে যাচ্ছে।

৩. প্রবাসীদের ভোটাধিকার ও পোস্টাল ব্যালট

বিগত দশকগুলোতে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে কেবল আলোচনা হলেও, ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এক কোটিরও বেশি প্রবাসী পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ভোট প্রদান করেছেন। এছাড়া কর্তব্যরত নির্বাচন কর্মকর্তা ও কারাবন্দিদের জন্যও পোস্টাল ব্যালটের ব্যাপক ব্যবহার এবারই প্রথম দেখা গেছে।

৪. 'জেন-জি' (Gen Z) ও তরুণদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য

ভোটার তালিকার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশই ছিল ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী তরুণ। এই বিশাল তরুণ গোষ্ঠী বা 'জেন-জি' ভোটাররাই এবারের নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। তাদের একক আধিপত্যের কারণে প্রথাগত দলীয় রাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গেছে।

৫. প্রযুক্তির ব্যবহার: ড্রোন ও বডি ক্যামেরা

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবারই প্রথম আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখা গেছে:

UAV ও ড্রোন: ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলো নজরদারির জন্য প্রথমবারের মতো ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।

বডি ক্যামেরা: পুলিশের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের পোশাকে প্রথমবারের মতো ২৫,০০০ বডি-ওর্ন ক্যামেরা লাগানো ছিল, যা সরাসরি নির্বাচন কমিশন থেকে মনিটর করা হয়েছে।

ব্লকচেইন রেজাল্ট: কারচুপি ঠেকাতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির অ্যাপের মাধ্যমে ভোটের ফলাফল লাইভ আপডেট দেওয়া হয়েছে।

৬. জাতীয় পরিচয় ও নতুন রাষ্ট্রীয় আদর্শ

সংবিধানের সংস্কার অনুযায়ী, এবারই প্রথম জাতীয় পরিচয় হিসেবে 'বাঙালি'র পরিবর্তে 'বাংলাদেশি' পরিচয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যাতে সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়। এছাড়া রাষ্ট্রের মূল চার স্তম্ভের পরিবর্তে 'সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার'—এই বিপ্লবী আদর্শগুলো প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

৭. 'না' ভোট (No Vote) এবং বিরোধী দলের ক্ষমতায়ন

বহু বছর পর ব্যালট পেপারে আবারও 'না' ভোট দেওয়ার অপশন চালু করা হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো নিয়ম করা হয়েছে যে, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অবশ্যই প্রধান বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন, যা আগে কখনো বাধ্যতামূলক ছিল না।

৮. জুলাই যোদ্ধাদের সরাসরি সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব

আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারা নিজেদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করে নির্বাচনে লড়াই করেছেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজপথের আন্দোলনকারীরা সরাসরি ব্যালট যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে সংসদে নিজেদের আসন নিশ্চিত করেছেন।

৯. ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা: নতুন মৌলিক অধিকার

নির্বাচনী ইশতেহার ও সংস্কার প্রস্তাবে প্রথমবারের মতো 'বিচ্ছিন্নতাহীন ইন্টারনেট সেবা' এবং 'ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা'-কে নাগরিকের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

২০২৬ সালের এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, বন্দুকের নল বা পেশীশক্তি নয়, বরং প্রযুক্তি এবং তারুণ্যের শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে আমূল বদলে দিতে পারে। এই 'প্রথম'গুলোই আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন মানদণ্ড।

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ