
সিনিয়ার রিপোর্টার

নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের অমরীকৃত ও সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহকে ঘিরে আজও মানুষের কৌতূহল ও আবেগের শেষ নেই। তার জীবনের নানা অধ্যায়, জনপ্রিয় সিনেমা কিংবা মৃত্যুর রহস্য আজও ভক্তদের মনে সমানভাবে আলোড়ন তোলে। ঠিক তেমনি বহু বছর আগে অভিনেতা ডনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হলে চলচ্চিত্র পাড়ায় এবং ভক্তদের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।
ভাইরাল হওয়া ওই ছবিতে অভিনেতা ডনের সঙ্গে এক নারীকে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে দেখা গিয়েছিল। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর দাবি তোলা হয়েছিল যে, ছবিতে থাকা ওই নারী আর কেউ নন, বরং প্রয়াত নায়ক সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা। এই গুঞ্জন মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং সামিরাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের তীর্যক মন্তব্য ও সমালোচনা শুরু হয়। তবে সময়ের আবর্তে সেই ছবির পেছনের আসল সত্য এবং চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো একে একে সামনে আসতে শুরু করে।
মোস্তাক ওয়াইজের চাঞ্চল্যকর তথ্য: ছবিটি সামিরার নয়, বরং নায়িকা সাবরিনার এবং তুলেছিলেন সালমান শাহ নিজেই
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সামিরাকে বিয়ে করেছিলেন মোস্তাক ওয়াইজ। পরবর্তীতে অবশ্য তাদের সেই দাম্পত্য জীবনেও বিচ্ছেদ ঘটে। বহু বছর আগে ভাইরাল হওয়া সেই আলোচিত ছবিটির সত্যতা নিয়ে মুখ খুলেছিলেন মোস্তাক ওয়াইজ। তার স্পষ্ট দাবি ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডনের সঙ্গে যে নারীকে সামিরা বলে প্রচার করা হয়েছিল, তিনি আদতে সামিরা ছিলেনই না; বরং তিনি ছিলেন সেই সময়ের চলচ্চিত্র জগতের এক অভিনেত্রী।
মোস্তাক ওয়াইজের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আশা ভালোবাসা’ সিনেমার শুটিং চলাকালীন সময়ে এই ছবি তোলা হয়েছিল। ওই সিনেমার মূল নায়ক ও নায়িকা ছিলেন যথাক্রমে সালমান শাহ ও শাবনাজ, আর ছবিটিতে পার্শ্বনায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সাবরিনা। শুটিংয়ের ফাঁকে দুষ্টুমি করে ঘরের ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে এই ছবিটি তুলেছিলেন স্বয়ং সালমান শাহ! পরবর্তীতে ডনকে নিয়ে মজা করার জন্য সালমান এই ছবিটি ব্যবহার করতেন বলেও জানান মোস্তাক। এছাড়া ডনের সঙ্গে সামিরার নামে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোর একটি বড় অংশই ফটোশপের মাধ্যমে এডিট বা জালিয়াতি করে তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
সামিরার আত্মপক্ষ সমর্থন ও আইনি লড়াই: ডন ছোট ভাইয়ের মতো, ভক্তদের ভুল ধারণার কড়া প্রতিবাদ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের নামে ছবি ভাইরাল হওয়া এবং ভিত্তিহীন অপপ্রচারের শিকার হওয়ার পর নিজের অবস্থান শক্ত হাতে পরিষ্কার করেছিলেন সামিরা। গণমাধ্যমের সামনে এসে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তার একটি পুরোনো ছবি কিংবা অন্য কারও ছবি ব্যবহার করে একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়াচ্ছে। সত্যতা না জেরে সালমান শাহর বহু ভক্ত তাকে ভুল বুঝে সামাজিক মাধ্যমে অহেতুক অপবাদ দিচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সামিরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, অভিনেতা ডন তার ছোট ভাইয়ের মতো এবং প্রতি ঈদে ডন তার পা ছুঁয়ে সালাম করতেন। সালমান শাহ ও তার পরিবার নিয়ে কখনোই কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করতে চাননি তিনি। তাছাড়া এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে সামিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্নও হয়েছিলেন। নিজের সম্মান রক্ষার্থে তিনি একাধিকবার ডিবি (গোয়েন্দা পুলিশ) কার্যালয়ে গিয়ে কথা বলেছেন এবং প্রশাসনের যেকোনো জিজ্ঞাসাবাদে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন বলে সে সময় উল্লেখ করেছিলেন।
অমর নায়ক সালমান শাহর বর্ণিল ক্যারিয়ার ও সামিরার সঙ্গে তার ঐতিহাসিক পরিণয়
নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে উল্কার মতো উদয় হয়ে রূপালি পর্দা কাঁপিয়েছিলেন সালমান শাহ। মাত্র চার বছরের ছোট্ট ও বর্ণিল ক্যারিয়ারে ২৭টি সুপারহিট চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মনে স্থায়ী আসন করে নেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যু পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তাঁর এই মৃত্যু নিয়ে আজও বিচারহীনতার আক্ষেপ ও রহস্যের জাল রয়ে গেছে।
চলচ্চিত্রের এই মহানায়কের ব্যক্তিগত জীবনের শুরুটা হয়েছিল প্রেমের হাত ধরে। ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট ভালোবেসে সামিরার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন সালমান শাহ। কিন্তু এই তারকা জুটির সুখের সংসার বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সালমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর থেকে সামিরাকে ঘিরে নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও পারিবারিক জটিলতা শুরু হয়, যার রেশ দীর্ঘ সময় ধরে দেশের শোবিজ অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে রেখেছিল।