ঢাকা, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২

হাসান

রিপোর্টার

৯ তলা থেকে লাফিয়ে তিন বোনের আত্মহ’ত্যা, যা জানালো পুলিশ

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪ নিউজ
২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৪ ১৯:৩১:৫২
৯ তলা থেকে লাফিয়ে তিন বোনের আত্মহ’ত্যা, যা জানালো পুলিশ

হাসান: ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে মর্মান্তিক এক ঘটনায় একসঙ্গে তিন বোনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে তারা তাদের নবম তলার বাসা থেকে নিচে ঝাঁপ দেয়। ঘটনাস্থলেই তিনজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুর আগে তারা হাতে লেখা একটি নোট রেখে যায়, যেখানে লেখা ছিল ‘সরি পাপা’।

পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত তিন বোনের নাম পাখি (১২), প্রাচী (১৪) ও বিশিকা (১৬)। তারা অনলাইনে একটি কোরীয় গেমে অতিমাত্রায় আসক্ত ছিল। সম্প্রতি মা–বাবা তাদের মুঠোফোন ব্যবহার সীমিত করে দিলে গেম খেলা বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত তাদের মানসিকভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত গাজিয়াবাদের ‘ভারত সিটি’ আবাসন কমপ্লেক্সে পরিবারটি বসবাস করত। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, গভীর রাতে তিন বোন বাসার বারান্দায় গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর জানালা দিয়ে একে একে তারা নিচে পড়ে যায়। চিৎকার ও বিকট শব্দে মা–বাবা, প্রতিবেশী এবং আবাসন কমপ্লেক্সের নিরাপত্তাকর্মীরা ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। মা–বাবা বারান্দার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলেও ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায়।

সহকারী পুলিশ কমিশনার অতুল কুমার সিং বলেন, “ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা নিশ্চিত হই যে চেতন কুমারের তিন মেয়ে ভবন থেকে পড়ে মারা গেছে।”

বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। তিন কিশোরীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং তাদের মা শোকে ভেঙে পড়ে চিৎকার করে কাঁদছিলেন। এলাকায় শোকাহত মানুষের ভিড় জমে যায়।

আট পৃষ্ঠার সুইসাইড নোট

তদন্তকারীরা একটি আট পৃষ্ঠার হাতে লেখা নোট ও একটি ডায়েরি উদ্ধার করেছেন। নোটে লেখা ছিল “এই ডায়েরিতে যা কিছু লেখা আছে, সব পড়ে নিও। কারণ এগুলোই সত্যি। এখনই পড়ো। আমি সত্যিই দুঃখিত। সরি পাপা।”নোটটির সঙ্গে হাতে আঁকা একটি কান্নার ইমোজিও ছিল।

ডায়েরির পাতাগুলোতে তাদের গেমিং অভ্যাস, মুঠোফোন ব্যবহার এবং মানসিক অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, তিন বোন কোরীয় সংস্কৃতির প্রতি অস্বাভাবিকভাবে আকৃষ্ট ছিল। তারা নিজেদের জন্য কোরীয় নামও ব্যবহার করত। মেজ বোন প্রাচী পরিবারে এবং ব্যক্তিগত জীবনে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করত বলে স্বজনরা জানান। ধারণা করা হচ্ছে, গেমিং আসক্তিতেও তার প্রভাব ছিল বেশি।

মেয়েদের বাবা চেতন কুমার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “ওরা বলত ‘পাপা সরি, কোরিয়া আমাদের জীবন, কোরিয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। আমরা এটা ছাড়তে পারব না।’”

তিনি আরও বলেন,“এমন ঘটনা যেন আর কোনো বাবা-মায়ের জীবনে না আসে। বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানদের গেমিং নিয়ে সচেতন থাকা। আমি জানতাম না বিষয়টা এত ভয়ংকর হতে পারে।”

তদন্তে জানা গেছে, তিন বোন প্রায় সব কাজ একসঙ্গে করত খাওয়া, গোসল এমনকি ঘুমানোও। কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকেই তাদের গেমিং আসক্তি শুরু হয়। এরপর তারা স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে পুরোপুরি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

তাদের শোবার ঘরের দেয়ালে কিছু আবেগঘন লেখা পাওয়া গেছে, যেমন ‘আমি খুব একা’ এবং ‘আমার হৃদয় ভেঙে গেছে’।

সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা নিমিশ প্যাটেল জানান, এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো গেমের নাম পাওয়া যায়নি। তবে এটা স্পষ্ট যে তারা কোরীয় সংস্কৃতির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল, যার উল্লেখ সুইসাইড নোটেও রয়েছে।

পুলিশ জানায়, চেতন কুমার দুই স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতেন। নিহত তিন বোনের মধ্যে দুজন এক স্ত্রীর সন্তান এবং অপরজন তাদের সৎবোন।

ঘটনাটি এলাকাজুড়ে শোকের আবহ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের অনলাইন গেমিং আসক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ