
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পতন পরবর্তী বাংলাদেশে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। আদালতের এই রায়ের পর এখন বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারত কি তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে?
আইনি মারপ্যাঁচে ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর বিশ্লেষণআন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ল স্কুলের দুই বিশেষজ্ঞ অভিনব মেহরোত্রা ও অমিত উপাধ্যায় এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তাদের মতে, হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা কেবল একটি আবেদনপত্রের বিষয় নয়; বরং এটি দীর্ঘ এক বিচারিক ও আমলাতান্ত্রিক যুদ্ধের নাম।
প্রত্যর্পণের পথে যে ৫টি পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ১. পলাতক অপরাধী তকমা: হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পলাতক অপরাধী’ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ২. দ্বৈত অপরাধের নীতি: ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে অপরাধে তাকে চাওয়া হচ্ছে, সেই একই কাজ ভারতেও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হবে। ৩. নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতা: বাংলাদেশের পাঠানো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও প্রমাণাদি ভারতের ‘কনসুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা’ (সিপিভি) বিভাগের মাধ্যমে একজন বিচারকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। ৪. সবচেয়ে বড় বাধা ‘মৃত্যুদণ্ড’: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ভারতের নিজস্ব নীতি অনুযায়ী, যে দেশে হস্তান্তরের পর আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি থাকে, সেখানে প্রত্যর্পণ সাধারণত নাকচ করা হয়। ৫. রাজনৈতিক অপরাধের সুরক্ষা: ভারত যদি মনে করে হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ‘রাজনৈতিক চরিত্র’ বহন করে, তবে তারা সরাসরি হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
দিল্লির রহস্যজনক নীরবতা ও কূটনৈতিক অবস্থান১৭ নভেম্বরের আদালতের রায়ের পর থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও দিল্লি সুকৌশলে সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্রকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে ভারত কি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করবে, নাকি ‘মানবিক কারণ’ দেখিয়ে হাসিনাকে নিজের দেশেই রেখে দেবে তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
পরিশেষে, শেখ হাসিনার হস্তান্তর এখন আর কেবল আইনি লড়াই নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির এক চূড়ান্ত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।