ঢাকা, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২

রাকিব

সিনিয়র রিপোর্টার

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ: দেখুন ১৮ মাসের সাফল্য ও ব্যর্থতা

জাতীয় ডেস্ক . ২৪ নিউজ
২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১১ ১৩:৪৪:৪১
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ: দেখুন ১৮ মাসের সাফল্য ও ব্যর্থতা

রাকিব: ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একটি সংকটময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রায় আঠারো মাস দায়িত্ব পালনের পর তাঁর সরকারের কার্যক্রম এখন জাতীয় রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যার মাধ্যমে এই সরকারের দায়িত্ব শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

সরকারের তিন প্রধান অগ্রাধিকার

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকার তিনটি মূল লক্ষ্য সামনে আনে—সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী তিন ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নানা বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা এসব অর্জনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সংস্কার কার্যক্রম: অগ্রগতি না বিতর্ক?

রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন গঠন করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে অন্তত ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করে। চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি—স্বল্প সময়ে এত বড় সংস্কার উদ্যোগ নজিরবিহীন। তবে সমালোচকরা বলছেন, প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে এডহক ও বাছাইভিত্তিক হয়েছে, যার ফলে ধারাবাহিকতা ও গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দ্বিমত

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সরকারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং আরও বহু মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সরকার এটিকে বড় অর্জন হিসেবে দেখালেও সমালোচকরা অভিযোগ করছেন—ঢালাও মামলা, বিতর্কিত গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন পেশার মানুষকে আসামি করার কারণে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আইন-শৃঙ্খলা ও ‘মব’ সহিংসতা

সরকারের মেয়াদে ‘মব সন্ত্রাস’ একটি আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। মাজার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও কিছু সংবাদমাধ্যম কার্যালয়ে হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগও উঠে এসেছে। সরকার বলছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ছিল কঠিন, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

নারীর অধিকার ও সামাজিক বাস্তবতা

নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নারী হেনস্তা ও সহিংসতার ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। যদিও অধ্যাপক ইউনূস নারীর ওপর হামলাকে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের বিরুদ্ধে বলে মন্তব্য করেছেন, তবু বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

অর্থনীতি: আংশিক স্বস্তি, স্থায়ী চাপ

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকার কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দাবি করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে এবং দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৭৭ শতাংশ এবং খাদ্যমূল্য, বিশেষ করে চালের দাম কমেনি।

বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম স্বাধীনতা

সরকার বলছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করেছে। তবে সাংবাদিক গ্রেপ্তার, অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল ও সংবাদমাধ্যমে হামলার ঘটনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকার কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা উন্নত হয়েছে বলে দাবি করছে।

সার্বিক মূল্যায়ন

অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে সংস্কার ও নির্বাচন আয়োজনের পথে অগ্রসর হওয়া এবং অর্থনীতিতে কিছু স্থিতিশীলতা আনাকে অনেকেই সরকারের অর্জন হিসেবে দেখছেন। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তা, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার ইস্যুতে গুরুতর সমালোচনা রয়েছে। আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে এই সরকারের উদ্যোগ কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই আঠারো মাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ