পাহাড়সম ঋণে ডুবতে বসেছে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার

পুঁজিবাজার থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে টাকা সংগ্রহ করতে আসছে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন। এর আগে ২০১৬ সালেও প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন পাওয়ার সময় ঋণ পরিশোধের কথা বলেছিল।  তবে ২০১৬ সালে ঋণ কমিয়ে আনতে চাওয়া এই কোম্পানিটিরই ৪ বছরের ব্যবধানে এখন কয়েক গুণ বেড়ে ঋণ পাহাড়সম হয়েছে। এমনকি সর্বশেষ অর্থবছরেও অনেক ঋণ সংগ্রহ করা হয়েছে। যে কোম্পানিটির আইপিওর ৫০ কোটি টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধে তেমন কোন প্রভাব পড়বে না।

জানা গেছে,কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। এরমধ্যে ৫০ কোটি টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে চায়। কোম্পানিটি এর আগেও পুঁজিবাজার থেকে টাকা নিয়ে ঋণ পরিশোধের কথা বলেছে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ঋণ নিয়েছে।

এদিকে এনার্জিপ্যাক ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি ট্রেডিং বিজনেসে বিনিয়োগ ও ঋণ পরিশোধের জন্য আইপিওতে আসার অনুমোদন পেয়েছিল। ওইসময় কোম্পানিটির (৩০ জুন ২০১৫) মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ৪ বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ করতে চাওয়া সেই কোম্পানির এখন মোট ঋণ বেড়ে দাড়িঁয়েছে ১ হাজার ৭৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকায়।   

পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে চাইলেও সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সমন্বিত হিসাবে এনার্জিপ্যাকের স্বল্পমেয়াদি ৬৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ও দীর্ঘমেয়াদি ৯৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ঋণ বেড়েছে।

এছাড়া কোম্পানিটির ২০১৯ সালের ৩০ জুনে সমন্বিত হিসাবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাড়িঁয়েছে ১ হাজার ৩২৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। এছাড়া স্বল্প মেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাড়িঁয়েছে ৩২৫ কোটি ৮২ লাখ টাকায় এবং ব্যাংক ওভারড্রাফট রয়েছে ৯৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যাংক ঋণ দাড়িঁয়েছে ১ হাজার ৭৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকায়। যা পরিশোধিত মূলধনের ১১.৬৫ গুণ ও ইক্যুইটি বা নিট সম্পদের ২.৫৪ গুণ। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি মাত্রাতিরিক্ত ঋণের কারণে ঝুকিঁতে রয়েছে।

এই ঋণের পাহাড়ের কারনে কোম্পানিটির ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সুদজনিত ব্যয় হয়েছে ১২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। যে কোম্পানির নিট মুনাফা হয়েছে ৪৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

এমন ঋণের পাহাড়ে অনেক কোম্পানিকেই দেউলিয়া হতে দেখা গেছে। এমনকি সম্প্রতি ঋণের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আমান ফিডের কারখান নিলামে তোলার বিজ্ঞপ্তি দেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

করপোরেট গভর্ণেন্স কোডের ব্যত্যয় ঘটেছে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশনে। ২০১৮ সালের জুনে সংশোধিত করপোরেট গভর্ণেন্স কোডের ১ (৪)(সি)-তে নন-এক্সিকিউটিভ পরিচালকদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচন করতে বলা হলেও এনার্জিপ্যাকে তা করা হয়নি। মাসিক ভিত্তিতে সম্মানি নেওয়া রবিউল ইসলাম এনার্জিপ্যাকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছে। এর মাধ্যমে করপোরেট গভর্ণেন্স কোডের এই নির্দেশনাটি ব্যত্যয় ঘটেছে। যা পরিপালন করা হয়নি বলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষও করপোরেট গভর্ণেন্স কোডের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। তবে নির্দেশনাটি ২০১৮ সালের হলেও রবিউল ইসলাম চলতি বছরের মার্চ থেকে বেতন নেন

না বলে রেড হেরিং প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি আইপিও বাতিল করা কিছু কোম্পানির কারন হিসেবে চেয়ারম্যানের সম্মানি নেওয়াকে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে এনার্জিপ্যাক থেকে কোটি কোটি টাকা সম্মানি নিচ্ছেন ৫ পরিচালক। প্রত্যেকে মাসে ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৭৭৫ করে বছরে ৯৫ লাখ ৭৩ হাজার ৩০০ টাকা নিচ্ছেন। যারা প্রত্যেকেই আরও কমপক্ষে ১০টি করে কোম্পানিতে যুক্ত আছেন। এরমধ্যে আইনগত বাধ্যবাধকতার কারনে এনার্জিপ্যাকের এমডি ছাড়া প্রত্যেক পরিচালক বিভিন্ন কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনার প্রধান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এমতাবস্থায় ওইসব কোম্পানি থেকেও যদি একই পরিমাণ নেন তাহলে দাড়াবে ১২ কোটি টাকা।

দেখা গেছে, এনার্জিপ্যাকের চেয়ারম্যান হিসাবে রয়েছেন রবিউল আলম। যিনি আরও ৫টি কোম্পানিতে এমডি এবং ৯ কোম্পানিতে পরিচালক পদে রয়েছেন। এছাড়া এমডি হূমায়ুন রশীদ ১৫ কোম্পানিতে পরিচালক পদে, পরিচালক এনামুল হক চৌধুরী ৬ কোম্পানির এমডিসহ আরও ৫ কোম্পানিতে পরিচালক পদে, নুরুল আক্তার ১ কোম্পানিতে এমডিসহ আরও ৭ কোম্পানিতে পরিচালক পদে এবং রেজওয়ানুল কবির ১ কোম্পানিতে এমডিসহ আরও ৮ কোম্পানিতে পরিচালক পদে রয়েছেন।

পুঁজিবাজারে আসাকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদেরকে আকৃষ্ট করতে এনার্জিপ্যাক এরইমধ্যে ৫ দফায় সম্পদ পূণ:মূল্যায়ন করেছে। ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৭ সালে পূণ:মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই দফায় দফায় পূণ:মূল্যায়নের মাধ্যমে কোম্পানিটির ২২৪ কোটি ৯ লাখ টাকার সম্পদ বেড়েছে।

তাছাড়া পুঁজিবাজারে আসাকে কেন্দ্র করে এনার্জিপ্যাকে মালিকানা বাড়ানোর লক্ষ্যে কয়েক হাজার শতাংশ পর্যন্ত বোনাস শেয়ার দিয়েছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। এছাড়া একই বছরে ২ বারও বোনাস শেয়ার দিয়েছে। তবে প্লেসমেন্টে ২০১৩ সালে শেয়ার ইস্যুর পরে এই বোনাস শেয়ার মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

কোম্পানিটিতে উদ্যোক্তা/পরিচালকেরা ১৯৯৫ সালে ৬ লাখ টাকা ও ২০০১ সালে ১৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। আর কোম্পানিটির বর্তমানের ১৪৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকার মূলধনে উদ্যোক্তা/পরিচালকেরা নগদ এই ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। তবে ২০১১ সালে ২০ লাখ টাকার উপরে ৪৭৫০ শতাংশ হারে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার বোনাস শেয়ার দিয়েছে। এরপরে ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার উপরে ৪৮০ শতাংশ হারে ২০১২ সালের ২৬ আগস্ট ৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বোনাস শেয়ার দেয়। এছাড়া একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর ৫৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার উপরে ১০৫ শতাংশ হারে ৫৯ কোটি ৭ লাখ টাকার বোনাস শেয়ার দেওয়া হয়। যাতে উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকার মালিকানা বেড়ে দাড়ায়

১১৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকায়।

এদিকে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর প্লেসেমেন্টে ২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার ইস্যু করা হয়। এরপরেই প্রতিষ্ঠানটির বোনাস শেয়ার নেমে আসে ৫ শতাংশে। ২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর এই হারে ৭ কোটি ১৪ লাখ টাকার বোনাস শেয়ার ইস্যু করা হয়েছে। এরমধ্যে প্লেসমেন্টধারীরা পেয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকার। আর বাকি ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা মূলধনের মালিকানা পেয়েছে উদ্যোক্তা/পরিচালকেরা।

কোম্পানিটির বিভিন্ন ধরনের পণ্যের মধ্যে রয়েছে-অ্যাসেম্বিলিং ম্যাটেরিয়ালস, জেনারেটর, সিএনজি সিলিন্ডার, পিক-আপ ভ্যান, কনস্ট্রাকশন মেশিন, এগ্রো মেশিনারীজ ইত্যাদি। ফেসবুকের মাধ্যমে আপনার মতামত জানান: ভালো লাগলে শেয়ার করবেন... Facebook Twitter Print

সর্বশেষ সংবাদ