আ.লীগ উপকমিটিতে দল-সরকার সমন্বয়, ‘বিতর্কিত’ এড়াতে ৪ ধাপে বাছাই

নৃপেন রায়, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘অনুপ্রবেশকারী’দের স্থান না নিয়ে ‘বিতর্কমুক্ত’ উপকমিটি গঠনে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। দল ও সরকারের সমন্বয় করে সাংগঠনিক নীতি ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যকে সামনের দিকে আরও জোরদার করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ‘স্বচ্ছ’ উপকমিটি গঠনে মনোযোগী ক্ষমতাসীন দলটি। এর জন্যই ‘বিতর্কিত’দের স্থান না দিতে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় চার ধাপে চলবে যাচাই-বাছাই। বিজ্ঞাপন

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ৩৫ সদস্যের উপকমিটির যেসব সম্পাদকীয় কমিটির সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তথা মন্ত্রণালয় রয়েছে, সেই কমিটির সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাকি সদস্যদের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির জন্য ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। একইসঙ্গে কমিটির প্রস্তাবনা জমা হলেই অনুমোদন হবে না। চার ধাপে যাচাই-বাচাই শেষ করে তবেই প্রতিটি উপকমিটির সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি চূড়ান্ত করা হবে। চলতি সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাবাহিক অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র।

গত সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় কমিটির বিষয়ভিত্তিক উপকমিটিগুলোর গঠন প্রক্রিয়া শেষ করার তাগাদা দেয় আওয়ামী লীগ। দলীয় সভাপতির কার্যালয়ে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে উপকমিটি জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ওই নির্দেশনার পর ছয়টি উপকমিটির তালিকা জমা পড়েছে। জমা পড়া কমিটিগুলোতে তিন থেকে পাঁচটি পদ ফাঁকা রাখা হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে বর্তমানে ১৯টি বিভাগীয় সম্পাদকের মধ্যে ১৮টি পদ পূর্ণ হওয়ায় একটি সম্পাদকীয় পদই শূন্য রয়েছে। বাকি ১২টি উপকমিটির তালিকা জমা পড়েনি এখনো।

আরও পড়ুন- ‘অনুপ্রবেশকারী’র ঠাঁই হলে দায় নেতার, কড়া হুাঁশিয়ারি আ.লীগে বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক সারাবাংলাকে বলেন, এবার উপকমিটি গঠনে কঠোর সতর্কতা ও কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উপকমিটিতে আদর্শহীন কেউ যেন স্থান না পায়, সেটিকে আমরা দৃষ্টি রাখব। এমন কেউ যদি কমিটিতে স্থান পায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কমিটির নেতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা বলব।

বিতর্ক এড়াতে উপকমিটিতে কাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে— জানতে চাইলে নানক বলেন, যারা সাবেক ছাত্রনেতা রয়েছে, যাদের মেধা-শ্রম এবং অতীতের সাংগঠনিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ রয়েছে, তাদেরকে সম্পৃক্ত করা হবে। আমরা বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করব। সব শেষে দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতিক্রমে কমিটি অনুমোদন পাবে।

অতীত ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি জানালেন আওয়ামী লীগের উপদফতর সম্পাদক সায়েম খানও। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে যারা আমাদের নেতারা আছেন, তাদের কর্মকাণ্ড বা রাজনৈতিক বোঝাপড়া, অতীত রাজনীতি— এগুলো দেখেই উপকমিটিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। দলের প্রয়োজনে যারা দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করতে চায়, যাচাই-বাছাই করে তাদের উপকমিটিতে স্থান দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে একজন কী করবে, বা করবে না— সেটা তো ভবিষ্যতের বিষয়। ভবিষ্যতে কেউ যদি শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো অপরাধ করে, সেটা তখন বিবেচনায় নেওয়া হবে। কিন্তু এখন যাদের স্বচ্ছ ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, দলীয় নীতি-আদর্শের বিষয়ে

কমিটমেন্ট রয়েছে— তাদেরই বিবেচনায় নেয়া হবে। আমাদের উপকমিটির সম্পাদকীয় দায়িত্বে আছেন যারা আছেন, তারা সিভি নিচ্ছেন এবং সেগুলো যাছাই-বাছাই করে কমিটি জমা দিচ্ছেন। বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, যেসব বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকীয় কমিটির সংশ্লিষ্ট বিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে, সেগুলোতে সরকারের সঙ্গে দলের সমন্বয়ের জন্য উপকমিটিতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের অন্তুর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত রয়েছে। এখন ওই কমিটি থেকে কতজন সদস্য উপকমিটিতে থাকবেন, এ বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে বলা নেই।

উপকমিটি জমা হলেই অনুমোদন পাবে না— এ বিষয়টি জানালেন সায়েম খানও। তিনি বলেন, কমিটি জমা হওয়ার পর আরও কয়েক ধাপে যাচাই-বাছাই হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উপকমিটিতে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বিতর্কিত’দের যেন স্থান না হয়, সেদিকে সতর্কতা অবলম্বন করতে চার ধাপে যাচাই-বাছাই চলবে। প্রথম ধাপে জমা হওয়া কমিটিগুলো দফতর সেল, দ্বিতীয় ধাপে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও তৃতীয় ধাপে দলের সাধারণ সম্পাদক সেই কমিটিগুলো যাচাই করবেন। চতুর্থ ও শেষ ধাপে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার টেবিলে যাচাই-বাছাই শেষে উপকমিটিগুলোর অনুমোদন হবে। এরপরও উপকমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বিতর্কিত’দের স্থান হলে সেই সংশ্লিষ্ট উপকমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব এবং সুপারিশকারী নেতাকে দায়ভার নিতে হবে। আর সংসদীয় কমিটির সদস্যদের আওয়ামী

লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে অন্তুর্ভুক্ত করতে হবে বলে নির্দেশনা রয়েছে। বিজ্ঞাপন

এর আগে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্পাদকমণ্ডলীর এক সভায় উপকমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। সভায় ভিডিও কনফারেন্সে গণভবন থেকে যুক্ত হয়ে এ বিষয়ে তাগাদা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, সেমিনার আয়োজন বা নীতিমালা প্রণয়ন, দলের ভবিষ্যৎ কর্মসূচিগুলো নির্ধারণ— এসব বিষয়কে গতিশীল করার জন্য উপকমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করতে নির্দেশনা দেন তিনি। ওই সভায় উপকমিটিগুলো চূড়ান্ত করতে দলীয় সভাপতির পক্ষ থেকে গাইডলাইন চান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

জানা যায়, দলের ২০০৯ সালের জাতীয় সম্মেলনে দলীয় গঠনতন্ত্রে সংশোধনীর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় উপকমিটি গঠনের বিধান সংযুক্ত হয়। প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের সঙ্গে সহসম্পাদকদের নিয়ে সে বিষয়ে একটি উপকমিটি গঠন করার কথা বলা হয়। বিধানে সহসম্পাদকদের পদ সংখ্যা নির্দিষ্ট না থাকায় অনেককে উপকমিটিগুলোতে স্থান দেওয়া হয় সহসম্পাদক হিসেবে। পরে ২০১২ সালের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে আরেক দফা সংশোধনীর মাধ্যমে একেকটি উপকমিটিতে পাঁচ জন করে সহসম্পাদক রাখার বিধান করে দেওয়া হয়। তাতে ১৯টি কেন্দ্রীয় উপকমিটিতে মোট ৯৫ জন সহসম্পাদকের পদ তৈরি হয়।

ওই বছর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে ওই সময়কার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ৬৩ জন সহসম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন। এর পরে যাদের উপকমিটিতে সহসম্পাদক পদে স্থান দেওয়া হয়, তাদের অনেককে নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়। উপকমিটি গঠনের প্রক্রিয়া, সহসম্পাদকদের যোগ্যতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। যেমন— ২০১২ সালে সৈয়দ আশরাফ ৬৩ জনের নাম ঘোষণা করার বেশকিছু দিন পর তৎকালীন এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে এ পদে প্রায় ৭০ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। দলীয় কার্যালয় থেকে এ প্রক্রিয়া না হওয়ায় সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

এরপর ২০১৬ সালে সহসম্পাদক পদ নিয়ে সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে। ওই সময় কেন্দ্রীয় সম্মেলনের পর দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত দফতর সম্পাদকের সইয়ে কাগজে-কলমে প্রায় ৪১৬ জনকে সহসম্পাদক পদ দেওয়া হয়। এতে অসংখ্য বিতর্কিত ব্যক্তি প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রের সংশ্লিষ্টতা পায়। এ নিয়ে সাবেক ছাত্রনেতাদের ক্ষোভের মুখেও পড়েন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে ২১তম জাতীয় সম্মেলনে উপকমিটির সহসম্পাদক পদটি বাতিল করে উপকমিটির সদস্য পদ অন্তর্ভুক্ত করে গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনে আওয়ামী লীগ। এসব উপকমিটিতেও যারা স্থান পেয়েছিলেন, তাদের নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সবশেষ করোনা পরীক্ষা

কেলেঙ্কারিতে জড়িত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ও সরকারি হাসপাতালে নকল মাস্ক সরবরাহ করা অপরাজিতা ইন্টারন্যাশনালের মালিক শারমিন জাহান আওয়ামী লীগের দুই উপকমিটির সদস্য ছিলেন বলে তথ্য প্রকাশ পেলে উপকমিটি নিয়ে বিতর্কের ষোলকলা পূর্ণতা পায়।

সারাবাংলা/এনআর/টিআর

সর্বশেষ সংবাদ