'আমি যে রিশকাওয়ালা গো…'

গ্রামের নাম রাজাবাসর। শুনলেই মনে হয় কোনো এক রাজার খুব ধুমধামে এখানে বাসর হয়েছিল। হয়তো রাজার পরিবারে জন্ম নিয়েছিল স্বপ্নের রাজকন্যা ও রাজপুত্র। তারা অবশেষে সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল–এমনই হয় আমাদের পৌরাণিক গল্পগুলো। কিন্তু এই রাজাবাসরে যে কামাল উদ্দিন বসবাস করে তার ঘরে তিন সন্তান, দুই মেয়ে এক ছেলে। তাদেরটাকেও সংসার বলা যায় কিন্তু সেখানে নেই প্রাচুর্য, বিত্ত এমনকি ন্যূনতম অর্থে বেঁচে থাকার অবলম্বন। করোনাভাইরাস আতঙ্কে তাদের জীবন হয়ে পড়েছে খুবই সংকটাপন্ন। আয় না থাকলেও রিকশাওয়ালা কামাল উদ্দিনের এই করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতেও ঈদের খরচের জন্য মেয়ে জামাইয়ের

হাতে দিতে হয়েছে ২ হাজার টাকা আর সাথে দুধ সেমাই চিনিসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র। কামাল বাড়ির পাশের ভিটার সামান্য জমি কিনেছিলেন আশা এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ করে, মাত্র ২ মাস কিস্তি চালানোর পর শুরু হলো লকডাউন। আগামী সপ্তাহ থেকে আবার কিস্তি দিতে হবে। টানা লকডাউনে আয় বন্ধ থাকলেও ঋণ বন্ধ থাকেনি। দিনাজপুরের পার্বতীপুরের রাজাবাসর গ্রামের কামাল উদ্দিন ঢাকায় থাকেন মোহাম্মদপুরের নবোদয় বাজারের পাশেই এক ঘরে ভাড়া থাকেন। রিকশাওয়ালাদের অবস্থা সম্পর্কে কামাল উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘যারা ক্যাশ ভাঙ্গি খেয়েচে তারা তো বাঁচি গেছে, আর যাদের টাহা নেই তারা তো শালা ঋণ

করে মরিছে’। তার কত ঋণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো সারা সময় প্রায় ঢাকাত ছিলাম তবুও ঋণ হবে ১৫/২০ হাজার টাহা’। অন্যদের কি অবস্থা জানতে চাইলে কামাল বলেন, ‘শতকরা ৯০ জনের একই অবস্থারে বাপু’।

চাঁদ উদ্যানের রিকশাওয়ালা শাহেদ আলী (৩৫) লক ডাউনের পুরো সময়ে ঢাকায় ছিলেন। কেমন ছিলেন জানতে চাইলে একটা করুণ হাসি দিয়ে বলেন, আল্লাহ রাখছিল আর কি! বাইচা আছি এইডাই কিন্তু তার পরের আলোচনায় যা জানা গেল তা হলো মানুষের দেয়া খাবার ও সহযোগিতায় শুরুর সময়গুলো তিনি কোনোরকম বেঁচে ছিলেন। পরে যখন রিকশা নিয়ে বের হওয়া যেত তখন থেকে নিজের খাবারটা জোগাড় করতে পেরেছেন। বাড়িতে পরিবার ও মা সন্তানদের খোঁজও নিতে পারেননি ঠিকমতো। মাসে মাসে যে টাকা পাঠানোর নিয়ম ছিল সেটাও ছিল না এই দু’মাসে। তবুও ঈদে ২ হাজার টাকা খরচ বাড়িতে পাঠাতে হয়েছে ঋণ করে। গ্যারেজের মালিক এবার বিনা সুদে টাকাটা দিয়েছে বলে

রক্ষে। করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে সে খুব জোরগলায় জানাল যে তার দেখা কোনো রিকশাওয়ালার করোনা হয় নাই। তারা পরিশ্রম করে, রোদে পুড়ে তাদের সহ্যশক্তি অনেক বেশি বলে সে একটা হাসি দিয়ে জানাল।

‘করোনাভাইরাসে না খেয়ে মরে যাবার অবস্থারে ভাই। আমি রিকশাওয়াল, সমাজের বড়লোক বা সরকার কেউ আমারে দেখার নাই। গত দুই মাসে অনেক টাকা ঋণ হয়ে গেছে।‘ কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের এক প্রত্যন্ত গ্রামের গাজী মিয়া। গ্রামে মা, বউ, সন্তান নিয়ে বড় পরিবার। ঈদের কয়েকদিন আগে ঋণ করে তিন হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন বহু কষ্টে, বাড়িতে মা অসুস্থ আর ছোট ছোট বাচ্চাগুলো না খেয়ে আছে। তিনি আরও বলেলেন, ‘ভাইরে দিনে এখন ১০ ঘন্টা রিকশা চালাই তবুও কোনো আয় হচ্ছে না। দিন শেষে যা টেকে তা দিয়ে কোনো সঞ্চয় হয় না।‘ সরকার থেকে তিনিও কোনো সহযোগিতা এই পুরো সময়ে পাননি বলে জানান।

কুষ্টিয়ার রিকশাওয়ালা কাউসার মিয়া লকডাউনের শুরুতে পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তার মা বারবার তাগিদ দিলেও সে যায়নি। মাকে সে বলেছে, ‘শুন মা সকলি মিলে মরার চেয়ে আমি এখানে বাঁচার চেষ্টা করি আর তোরাও ভালো থাক’। কিন্তু মা ও পরিবার বারবার কেঁদেকেটে বাড়িতে যেতে বলেছে কিন্তু সে যায়নি। কাউসারের কথা, ‘ভাই চিন্তা করছি গ্রামে গিয়া করব কি আর তাই ঘাপটি মেরে ঢাকায় পড়েছিলাম। এখনও টিকে আছি। কিন্তু আমার গেরেজে ১৫০টা গাড়ি কিন্তু ড্রাইভার আছে ৬ জন। যারা গ্রামে গেছে তারা এখনও ফিরে নাই। তাদের অনেকেই গ্রামে থেকে ফোন করে কান্নাকাটি করে। গ্রামে তারা খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে।

সবারই অনেক টাকা ঋণ হয়ে গেছে। তবে আমার কপাল ভালো যে ঋণ হয়নি। আল্লাহ একদিক দিয়ে বাঁচায়ে দিছে।”

এই হলো রিকশাওয়ালাদের বর্তমান করোনাকালীন জীবনের একটা সাধারণ চিত্র। এই রিকশা শ্রমিকরা সামনে আরও একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বলে আমার ব্যক্তিগত অভিমত। এই সংকট থেকে সহসা উত্তরণের কোনো পথও আপাতত চোখে দেখা যাচ্ছে না। এই ঋণগ্রস্থ বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে অবশ্যই এই সংকটের পথ থেকে বের করার উদ্যোগ রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।

রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘রিকশা শ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছে। লকডাউনের শুরু থেকে তাদের ৭০ ভাগই গ্রামে চলে যায়। উপার্জিত অর্থের সবটাই তারা গ্রামে নিয়ে গিয়েও এখন ঋণের জালে জর্জরিত। গ্রামে পরিবার অভুক্ত প্রায়। আর শহরের রিকশাওয়ালের অবস্থা আরও খারাপ। কারণ গ্রামে যারা থাকে তাদের অন্তত থাকার জায়গা থাকে, আত্মীয় পরিজনরা দেখে কিন্তু ঢাকায় যারা থাকে তাদের দেখার কেউ থাকে না। সকলেই ঋণে একদম জর্জরিত।‘ তিনি আরও বলেন, ‘এই রিকশাওয়ালাদের দিকে সরকারের আলাদা নজর দেয়া দরকার। কারণ এরা সারাবছর এই শহরের মানুষের সেবা করে আর আজ

তাদের এই দুর্যোগে সরকারের উচিত তাদের ঋণের বোঝা কমানোর একটা পথ বের করে দেয়া। কারণ এই রিকশাওয়াদের যাবার আর কোনো জায়গা নেই।‘ তিনি রিকশাওয়াদের সকল ঋণের সুদ মওকুফ ও সহজ শর্তে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার রাইটস বা বিলস এর তথ্য অনুযায়ী ঢাকা শহরে প্রায় ১১ লক্ষ রিকশা চলছে যা বিভিন্ন সংস্থা থেকে নিবন্ধিত। আর এ রিকশার ওপর জীবন-জীবিকা হলো ২৭ লক্ষ মানুষের। রিকশা সাধারণ দুই শিফটে চলে বলে এক্ষেত্রে যে রিকশা সকালে একজন চালায়, বিকালে কিন্তু তা আরেকজনের হাতে চলে যায়। এছাড়া রিকশা মেরামত, সারাই, গ্যারেজের ব্যবসায়ী সব মিলিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠী বিলস এর গবেষণায় বেরিয়ে আসে। বিলসের গবেষণায় এটাও দেখা গিয়েছিল যে ৯৪ ভাগ রিকশাওয়ালা শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকেন আর ৩০ ভাগ সরাসরি জন্ডিসে আক্রান্ত। তাদের খাবার পানি, খাদ্য, টয়লেট ব্যবস্থাপনা, বাসস্থান নিয়েও এক করুণ

চিত্র বিলস এর গবেষণায় উঠে আসে।

এই চিত্রগুলো তুলে ধরা বা চিত্র দেখিয়ে আফসোস কুড়ানো আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়। এই রিকশাওয়ালদের উপর আমি নিজেও বিরক্ত হই, রাগ দেখাই। কিন্তু এই শ্রেণির অবদান এই শহরে কি কম? ২৭ লক্ষ পরিবার মানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার কত ভাগ হয়? এই শহরে ৪০ লক্ষ নিম্ন আয়ের ও ভাসমান মানুষ তাদের সিংহভাগই রিকশা শ্রমিক। এরা সাধারণত দিন এনে দিন খায়। এই সংকটাপন্ন মানুষগুলোর দিকে সরকার তার সুনজর দেবে এটাই কাম্য। একজন রাজাবাসরের কামাল উদ্দিনের জীবন রাজার মতন না হোক, একজন সাধারণ নাগরিকের হোক। যে নাগরিক তার ন্যায্য হিস্যাটা পাবে এই রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে।

সর্বশেষ সংবাদ